সাহাজুল সাজু :
মশার কয়েলের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অসহায় বিধবা রংফুল বেগমের শেষ আশ্রয়টুকু। ঘরের ধান, চাল, গম, আটা, ভূট্টা, বিছানাপত্র, কাপড়চোপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু পুড়ে গেছে। আগুনে রক্ষা পায়নি তার ৩২ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী ছেলে রাসেলের চলাচলের একমাত্র অবলম্বন হুইলচেয়ারটিও। এক রাতের আগুনে সবকিছু হারিয়ে এখন চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটানোর শঙ্কায় পড়েছেন মা-ছেলে।
সােমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ষোলটাকা ইউনিয়নের আমতৈল গ্রামের পালপাড়ায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মশার কয়েল থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সােমবার রাতেও একমাত্র সন্তান প্রতিবন্ধী রাসেলকে নিয়ে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রংফুল বেগম। এ সময় ঘরে জ্বালানো মশার কয়েল থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে আগুন। চোখের পলকেই আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নেয় তাদের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়টুকু।
আগুন দেখে চিৎকার শুরু করেন রংফুল বেগম। তার চিৎকার শুনে আশপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। পরে স্থানীয় লোকজন প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পানি ঢেলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তবে ততক্ষণে ঘরের প্রায় সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
আগুন নিভে যাওয়ার পর দেখা যায়, ঘরে সংরক্ষিত ধান, চাল, গম, আটা, ভূট্টাসহ খাদ্যসামগ্রী, বিছানাপত্র, কাপড়চোপড় এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। এমনকি প্রতিবন্ধী রাসেলের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হুইলচেয়ারটিও আগুনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। বসতঘর ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু হারিয়ে এখন দিশেহারা রংফুল বেগম। তাদের সামনে দেখা দিয়েছে খাবার ও মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে অনিশ্চয়তা।
জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে রংফুল বেগমের স্বামী রফিকুল ইসলাম কোথায় যেন চলে যান। এরপর থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি। স্ত্রী-সন্তানের কোনো খোঁজখবরও নেননি বলে জানান রংফুল বেগম। তার স্বামী বর্তমানে জীবিত আছেন, নাকি মারা গেছেন, সে সম্পর্কেও পরিবারের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
স্বামীর অনুপস্থিতিতে প্রতিবন্ধী একমাত্র সন্তান রাসেলকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করে আসছেন রংফুল বেগম। অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে ছোট্ট কুঁড়েঘরটিতে কোনোভাবে দিন পার করছিলেন তারা। কিন্তু আগুনে সেই ঘরটিও পুড়ে যাওয়ায় এখন কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন মা-ছেলে।
একদিকে স্বামীর দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানোর কঠিন সংগ্রাম। এর মধ্যেই নতুন করে এই বিপর্যয় নেমে এসেছে তার জীবনে। ঘরের খাবার, পরনের কাপড়, বিছানাপত্রসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু হারিয়ে এখন অন্যের সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী রাসেলের হুইলচেয়ার পুড়ে যাওয়ায় তার চলাচল ও দৈনন্দিন জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
এ অবস্থায় অসহায় রংফুল বেগম ও তার প্রতিবন্ধী ছেলে রাসেলের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের জন্য জরুরি খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, বসবাসের ব্যবস্থা, ঘর পূন:র্নির্মাণে আর্থিক সহায়তা এবং একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা গেলে পরিবারটি নতুন করে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পাবে।
একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরই ছিল অসহায় মা-ছেলের শেষ আশ্রয়। সেই ঘরটিও আগুনে পুড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। এখন মানবিক সহায়তা ও সমাজের সহৃদয় মানুষের এগিয়ে আসাই পারে রংফুল বেগম ও তার প্রতিবন্ধী ছেলে রাসেলের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে। এ বিষয়ে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক শিল্পী রাণী রায় জানান,বিষয়টি খােঁজখবর নিয়ে সহায়তা করা হবে।